Not a member of Pastebin yet?
Sign Up,
it unlocks many cool features!
- রাসূলের আত্মহত্যার প্রচেষ্টা!
- ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এখানে জ্ঞানকে একটা চর্চা ও গবেষণার বিষয় না মনে করে প্রোপাগান্ডা ও ইনডকট্রিনেশনের টুল হিসেবে দেখা হয়। সালাফের যুগে অনেক সুফি তৈরি হয়েছিলেন যারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলের নাম হাদীস জাল করতেন। তাদের যুক্তি ছিল মানুষকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য এবং ভাল কাজে উৎসাহিত করার জন্য রাসূলের নাম ব্যাবহার করা বেশ কার্যকরী। জ্ঞানগত সততার ওপর মতবাদ প্রচারের তাড়না প্রাধান্য বিস্তার করলে তখন তাকে প্রোপাগান্ডা বলা হয়।
- এমনই এক প্রোপাগান্ডার অংশ হল “কোরআনের পর বিশুদ্ধতম গ্রন্থ হচ্ছে সহীহ বুখারী” এই বাক্য শুনে সাধারণ মানুষের ধারণা তৈরি হয় যে, কোরআন সংকলনের ক্ষেত্রে যেই পরিমাণ বিশুদ্ধতা পাওয়া যায়, বুখারীর সংকলনের ক্ষেত্রে তার কাছাকাছি বিশুদ্ধতা ছিল! খুবই গুরুতর এক বিভ্রান্তি।
- ১. কোরআনের সংকলন হয়েছে মুতাওয়াতির ভাবে। দুই দিক থেকে। কোরআনের প্রত্যেকটা আয়াত স্বতন্ত্রভাবে মুতাওয়াতির। এই আয়াতগুলোর একাধিক কিরাআত আছে। এগুলোও মুতাওয়াতির। কোরআনকে যে গ্রন্থে সংকলন করা হয়েছে সেটাও মুতাওয়াতির। বিপরীতে বুখারীর অল্প কয়েকটা হাদীস বাদে বাকিগুলো সবই খবরে ওয়াহেদ। গ্রন্থ হিসেবেও বুখারীর একটিমাত্র সনদ আছে। আল ফারাবরীর সূত্রে। তার উপর বুখারীতে বর্ণিত বহু হাদীসের সনদ ও মতন নিয়েই ফারাবরীর সূত্র বর্ণনাকারীদের পার্থক্য রয়েছে। ইমাম ইবনুল মিবরাদ এই ভিন্নতা বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র বই-ই লিখেছেন الاخْتِلافُ بَيْنَ رُواةِ البُخارِيِّ عَنِ الفَرَبْرِيِّ
- ২. বুখারীর সব হাদীস মুসনাদ নয়। যেই মানদণ্ড বজায় রাখার কারণে বুখারীর নাম সহীহ রাখা হয়েছে সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না এমন বহু হাদীস আছে, যেমন মুয়াল্লাক হাদীস। বুখারী কোন অধ্যায়ের সূচনায় এই মুয়াল্লাক হাদীসগুলো উল্লেখ করেন। এই মুয়াল্লাক হাদীসগুলোর অধিকাংশই সনদের দিক থেকে দুর্বল।
- ৩. বুখারীর অনেকে হাদীসের সনদে রাবীর নাম নিয়ে তাদলিস আছে, বুখারীর প্রচুর হাদীস মুদরাজ ফিল মতন। অর্থাৎ বর্ণনাকারীর নিজস্ব মতামতকে রাসূলের হাদীসের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। রাসূলের আত্মহত্যার চেষ্টার কথাটাও এমন মুদরাজ ফিল মতন। মূলত এটা যুহরীর বক্তব্য। অথচ হাদীস পড়লে মনে হবে এটা আয়েশার কথা! বুখারীর এক হাদীসে আছে মানুষের উচ্চতা প্রতিনিয়ত খাটো হচ্ছে। এটাও মুদরাজ ফিল মতন। এই হাদীসের সকল বর্ণনাসূত্র একত্র করলে এটা বেরিয়ে যায়। ওয়াজাগ (টিকটিকি/গিরগিটি/গুইসাপ) মারলে সোয়াব হয় এটাও এরকম।
- ৪. বুখারীতে মুনকার হাদীস আছে। যেমন: এক বানর পরকীয়া করায় তাকে অন্যান্য বানররা রজম শাস্তি দিচ্ছে এই বর্ণনা। ইমাম হুমায়দী বলেছেন, এই হাদীস বুখারীর মূল কপিতে ছিল না, এটা বহিরাগত। এছাড়াও আছে, মুসা আলাইহিস সালাম উলঙ্গ হয়ে দৌড়াদৌড়ি করার বর্ণনা। ইব্রাহিম নবি মিথ্যা কথা বলেছেন এই বর্ণনা। ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি তার তাফসীরে এই বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
- ৫. বুখারীর বহু হাদীস ইল্লতযুক্ত। যেমন: সূর্যগ্রহণের নামাজ রাসূল জীবনে একবার কেবল পড়েছেন তার পুত্র সন্তান ইব্রাহিমের ইন্তেকাল হলে। অথচ এই একটা নামাজের ভিন্ন ভিন্ন একাধিক বিবরণ আছে বুখারীতে।
- ৬. বুখারীতে রাসূলের হাদীসের আক্ষরিক উপস্থাপন নেই। ইমাম বুখারী বহুক্ষেত্রে অর্থ অনুযায়ী বর্ণনা করতেন। এছাড়াও বুখারী একটি হাদীসের মতনকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন আকারে একাধিক স্থানে উল্লেখ করতেন। মাগরিবের বহু আলেম সেই প্রাচীনকাল থেকেই সহীহ মুসলিমকে বুখারীর চেয়ে বিশুদ্ধ মনে করতেন।
- এত কিছুর পরেও কিভাবে এই প্রোপাগান্ডা চালানো হয় যে, বুখারীর মর্যাদা কোরআনের ঠিক পরেই? এ তো আল্লাহর কিতাবের প্রতি অবমাননার শামিল!
- আমার উপরোক্ত আলোচনা থেকে কেউ ভাববেন না যে, আমি বুখারীকে ডিসমিস করে দিচ্ছি। কখনোই না। বরং বলছি যে বুখারী নিয়ে যে পূজা অর্চনার কালচার তৈরি হয়েছে তা বর্জন করতে। বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসদের মত একজন মুহাদ্দিস। উলুমে হাদীস ও উসুলে ফিকহের যেই মেথডোলোজি আছে, বুখারী সেই মেথডোলোজির ঊর্ধ্বে নয়। হাদীস ক্রিটিসিজমের কষ্টিপাথর থেকে বুখারীকেও বাদ দেয়া হবে না। কারো জন্য একস্ট্রা খাতির নেই।
- এই ভূমিকার পর রাসূলের আত্মহত্যার আলোচনায় আসা যাক। উপরের ৩ নম্বর পয়েন্টে ফাতহুল বারী থেকে উল্লেখ করেছি যে, এটা তাবেয়ি যুহরীর বক্তব্য। তিনি বলেছেন,
- [অনুবাদ এখান থেকে নিয়েছি http://ihadis.com/books/bukhari/hadis/6982]
- এমনকি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থার কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে, তিনি পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিব্রীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ! নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর অস্থিরতা দূর হত এবং নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওয়াহী বন্ধ অবস্থা যখন তাঁর উপর দীর্ঘ হত তখনই তিনি ঐরূপ উদ্দেশে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিব্রীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে আগের মত বলতেন।
- হাদীসের এই অংশের ক্ষেত্রে আপনার দুইটি অপশন আছে।
- ১) যুহরির শোনা কথায় কান না দেয়া। তিনি হয়ত ভুল শুনেছেন।
- ২) যুহরীর বক্তব্যের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়া।
- ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীতে বলেন,
- لِأنَّ النُّبُوَّةَ لا تُزِيلُ طِباعَ البَشَرِيَّةِ كُلَّها فَلا يُتَعَجَّبُ أنْ يَجْزَعَ مِمّا لَمْ يَأْلَفْهُ ويَنْفِرَ طَبْعُهُ مِنهُ حَتّى إذا تَدَرَّجَ عَلَيْهِ وألِفَهُ اسْتَمَرَّ عَلَيْهِ
- “নবুওতের মাধ্যমে সকল মানবীয় স্বভাবপ্রকৃতি মিটে যায় না। সুতরাং অভ্যস্ততা নেই এমন বিষয়ে ভয় পেয়ে যাওয়া, মন বিকর্ষিত হওয়াতে অবাক হবার কিছু নেই। বরং ধাপে ধাপে অগ্রসর ও ধাতস্থ হবার মাধ্যমে এটা নিয়মিত বিষয় হয়ে যায়।”
- ثُمَّ كانَ مِن مُقَدِّماتِ تَأْسِيسِ النُّبُوَّةِ فَتْرَةُ الوَحْيِ لِيَتَدَرَّجَ فِيهِ ويَمْرُنَ عَلَيْهِ فَشَقَّ عَلَيْهِ فُتُورُهُ إذْ لَمْ يَكُنْ خُوطِبَ عَنِ اللَّهِ بَعْدُ أنَّكَ رَسُولٌ مِنَ اللَّهِ ومَبْعُوثٌ إلى عِبادِهِ فَأشْفَقَ أنْ يَكُونَ ذَلِك أمر بُدِئَ بِهِ ثُمَّ لَمْ يَرِدِ اسْتِفْهامُهُ فَحَزِنَ لِذَلِكَ حَتّى تَدَرَّجَ عَلى احْتِمالِ أعْباءِ النُّبُوَّةِ والصَّبْرِ عَلى ثِقَلِ ما يَرِدُ عَلَيْهِ فَتَحَ اللَّهُ لَهُ مِن أمْرِهِ بِما فَتَحَ
- “এছাড়াও নবুওতের প্রতিষ্ঠা লাভের প্রাথমিক দিকে ওহীর সাময়িক বিরতি দেয়া হয় যাতে ধাপ অতিক্রম করে নতুন স্তরে পদার্পণ করার অনুশীলন হয়। সাময়িক এই বিরতি তার মনোযাতনার কারণ হয়। কারণ তাকে জানানো হয়েছিল যে আপনি আল্লাহর রাসূল এবং তার বান্দাদের প্রতি প্রেরিত। এতটুকুর পর বিরতি চলে আসায় তার মনে ভয় তৈরি হয় যে, একটা কথা শুরু করেও শেষ করা হল না। এতে তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। অবশেষে তিনি এই স্তর অতিক্রম করে ফেলেন এবং নবুওতের বিশাল বোঝা বহন করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত নানান ঘটনার চাপ সহ্য করার যোগ্যতা লাভ করেন।”
- وأمّا إرادَتُهُ إلْقاءَ نَفْسِهِ من رُؤُوس الجبال بعد ما نُبِّئَ فَلِضَعْفِ قُوَّتِهِ عَنْ تَحَمُّلِ ما حَمَلَهُ مِن أعْباءِ النُّبُوَّةِ وخَوْفًا مِمّا يَحْصُلُ لَهُ مِنَ القِيامِ بِها مِن مُبايَنَةِ الخَلْقِ جَمِيعًا كَما يَطْلُبُ الرَّجُلُ الرّاحَةَ مِن غَمٍّ يَنالُهُ فِي العاجِلِ بِما يَكُونُ فِيهِ زَوالُهُ عَنْهُ ولَوْ أفْضى إلى إهْلاكِ نَفْسِهِ عاجِلًا حَتّى إذا تَفَكَّرَ فِيما فِيهِ صَبْرُهُ عَلى ذَلِكَ مِنَ العُقْبى المَحْمُودَةِ صَبَرَ واسْتَقَرَّتْ نَفْسُهُ
- “নবুওত প্রাপ্তির পর পাহাড় থেকে নিজেকে ফেলে দেয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হবার ব্যাখ্যা হচ্ছে, এটা হচ্ছে নবুওতের প্রচণ্ড ভার সহ্য করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থেকে, এছাড়াও নবুওয়তের মিশনে সকল মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে। যেভাবে কোন মানুষ মাঝে প্রচণ্ড গাম (ডিপ্রেশন) এর মধ্য দিয়ে গেলে এমন কিছু করে এ থেকে মুক্তি পেতে চায় যাতে এটা দুর হয়ে স্বস্তি লাভ হয়, এমনকি এতে যদি তাৎক্ষণিকভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া লাগে তবুও। কিন্তু যখন ব্যক্তি ধৈর্য ধরে থাকলে যে প্রশংসনীয় পুরষ্কার লাভ হবে তা নিয়ে চিন্তা করে তখন ধৈর্য ধরতে ও তা অব্যাহত রাখতে সমর্থ হয়।”
- এই গেল একটা ব্যাখ্যা। আরেকটা ব্যাখ্যা এমন সম্ভব – ওহী লাভের স্বাদ লাভ করার পর রাসূলের মনে আল্লাহর কালামের যে ফয়েজ ও মিষ্টতা লাভ হয় সেটা একবার চেখে ফেলার পর রাসূলের নিজেকে ওহী ব্যতিরেকে আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হচ্ছিল না। ড্রাগসে যারা একবার আসক্ত হয়ে তারা যেভাবে এটা ছাড়া বেচেইন হয়ে যায়, তেমনি আল্লাহর কালামে একবার নবি আসক্ত হয়ে যাওয়ার পর মানবীয় স্বভাবের কারণে তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন। এই অস্থিরতা তৈরি হবে বলেই আল্লাহ কিছুদিন ওহী প্রেরণ বন্ধ রাখা হয় যাতে আধ্যাত্মিকতা ও মানবীয় স্বভাবের মাঝে ভারসাম্য ফিরে আসে।
- আপনার কাছে যদি এই ব্যাখ্যাগুলো সন্তোষজনক মনে না হয়, খুব বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই। বুখারীতে থাকলেই সেটা অকাট্য সত্য হয়ে যাবে, সেটা অবিশ্বাস করলে গোমরাহী হবে এরকম ভাবারও কারণ নেই।
- আপনাদের মনে রাখতে হবে যে, হেদায়েতের উৎস কোরআন ও সুন্নত। হাদীস আর সুন্নত এক বিষয় নয়। সুন্নতকে জানার অনেক গুলো পদ্ধতি আছে তার মধ্যে হাদীস একটি। এছাড়াও উপরে উল্লেখ করেছি যে, হাদীসের শুদ্ধতা ও সঠিক ব্যাখ্যা জানার জন্য উলুমে হাদীসের বিভিন্ন শাস্ত্র আছে, উসুলে ফিকহ আছে। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার পরিণতি কখনো শুভ হয় না।
Advertisement
Add Comment
Please, Sign In to add comment