Not a member of Pastebin yet?
Sign Up,
it unlocks many cool features!
- বিয়ে ও তাজদীদ
- বলেছিলাম বিয়ের পুনঃসংজ্ঞায়ন প্রয়োজন।
- প্রশ্ন : কোন ধরণের সংজ্ঞার কথা বলছি?
- উত্তর - আইনি সংজ্ঞা।
- : কিন্তু বিয়ে তো আইনের বিষয় না, আবেগ ও অনুভূতির বিষয়?
- - আইন আপনার আবেগ ও অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- : কীভাবে?
- - মুতা কিংবা সাময়িক বিয়ের কথা চিন্তা করুন। বিয়ের মেয়াদ একসময় উত্তীর্ণ হয়ে যাবে জানা থাকলে আপনার আবেগ-অনুভূতি কি স্বাভাবিক বিয়ের মত থাকবে? কিংবা ধরুন আইন মতে স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া কিছুই করতে পারবে না, কার্যত দাসীসুলভ জীবন অতিবাহিত করবে এই আইনটা জানা থাকলে কি আবেগ-অনুভূতিতে পরিবর্তন আসবে না? স্বামী স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই তার সাথে সহবাস করতে পারবে, কিন্তু স্ত্রী পারবে না ইত্যাদি ফিকহি/আইনি বিষয়গুলো বিয়ের আগেই আপনার বিয়ে সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দিবে। বহুবিবাহের বিষয়ের ফিকহি দিকটাও এই জায়গা থেকে প্রাসঙ্গিক। স্বামী স্ত্রীকে না জানিয়ে আরো তিনটা বিয়ে করতে পারবে এই ফিকহি রুলিংটা স্ত্রীর আবেগ-অনুভূতিতে অনেক তারতম্য আনবে। স্ত্রী সবসময় স্বামীর প্রতি একটা সন্দেহ পুষে রাখবে। আমি আরো উদাহরণ টানতে পারব। সংক্ষিপ্ত করতে চাচ্ছি।
- : আচ্ছা, বিয়ের আইনি সংজ্ঞাটা কী যেটা আপনি পরিবর্তন করতে বলছেন?
- -
- قَال الْحَنَفِيَّةُ: النِّكَاحُ عَقْدٌ يُفِيدُ مِلْكَ الْمُتْعَةِ بِالأُنْثَى قَصْدًا، أَيْ يُفِيدُ حِل اسْتِمْتَاعِ الرَّجُل مِنَ امْرَأَةٍ لَمْ يَمْنَعْ مِنْ نِكَاحِهَا مَانِعٌ شَرْعِيٌ
- হানাফি আইনজ্ঞদের মতে, বিয়ে হচ্ছে একটি চুক্তি যার মাধ্যমে সচেতনভাবে একজন গায়রে মাহরাম নারীকে সম্ভোগ করার মালিকানা লাভ হয় (ফাতহুল কাদীর, রদ্দুল মুহতার)
- وَقَال الْمَالِكِيَّةُ: النِّكَاحُ عَقْدٌ لِحِل تَمَتُّعٍ بِأُنْثَى غَيْرِ مَحْرَمٍ وَمَجُوسِيَّةٍ وَأَمَةٍ كِتَابِيَّةٍ بِصِيغَةٍ
- মালেকিদের মতে, বিয়ে হল এমন চুক্তি যার দ্বারা গায়রে মাহরাম নারী, মুসলিম, মাজুসি অথবা কিতাবি দাসীকে সম্ভোগ করার বৈধতা নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে কার্যকর হয় (শারহুস সগির)
- وَقَال الشَّافِعِيَّةُ: النِّكَاحُ عَقْدٌ يَتَضَمَّنُ إِبَاحَةَ وَطْءٍ بِلَفْظِ إِنْكَاحٍ أَوْ تَزْوِيجٍ أَوْ تَرْجَمَتِهِ
- শাফেয়িদের মতে, বিয়ে হচ্ছে এমন চুক্তি যাতে অন্তর্ভূক্ত থাকে সহবাসের বৈধতা এবং এটি নিকাহ, বিয়ে কিংবা সমার্থক শব্দ দ্বারা সম্পাদিত হয় (নিহায়াতুল মুহতাজ, মুগনিল মুহতাজ)
- وَقَال الْحَنَابِلَةُ: النِّكَاحُ عَقْدُ التَّزْوِيجِ، أَيْ عَقْدٌ يُعْتَبَرُ فِيهِ لَفْظُ نِكَاحٍ أَوْ تَزْوِيجٍ أَوْ تَرْجَمَتُهُ
- হাম্বলিদের মতে, বিয়ে হচ্ছে নারীপুরুষের জোড়াবদ্ধ হবার চুক্তি, এটি এমন চুক্তি যাতে নিকাহ, বিয়ে কিংবা সমার্থক শব্দ উচ্চারণ বিবেচনা করা হয় (কাশশাফুল ক্বিনা)
- খেয়াল করলে দেখবেন একমাত্র হাম্বলিদের সংজ্ঞাতেই সম্ভোগ কিংবা সহবাসের কথাটি নেই। এই সংজ্ঞায়নগুলোর কারণে মাযহাবগুলোর মাঝে আইনি অনেক তারতম্য আছে। যেমন - নিকাহ শব্দটা কি চুক্তি বোঝায় নাকি সহবাস? এই কারণে হুরমতে মুসাহারা নিয়ে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে। আমি এদিকে গেলাম না।
- অন্য একটা প্রাসঙ্গিক দিক নিয়ে কথা বলি - নারী যদি বিয়ের আগে স্বামীর উপর শর্ত আরোপ করে যে, আমি থাকতে বহুবিবাহ করতে পারবে না, তাহলে হাম্বলিদের মতে এই শর্ত কার্যকর হবে। যদি স্বামী বহুবিবাহ করে ফেলে, তবে স্ত্রী চাইলে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারবে।
- : এটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
- - কারণ ইসলামি আইনে নারীর জন্য বিয়ে করে ফেলা যত সহজ, বিয়ে ভেঙে দেয়া ঠিক ততটুকুই কঠিন। নারীকে বিয়ে ভেঙে দেয়ার কোন অধিকারই দেয়া হয় না। বিয়ে যদি ভাঙতেই হয় তবে খোলা করার জন্য কোর্টের শরণাপন্ন হতে হবে, কোর্ট যদি বিয়ে ভাঙতে রাজি হয়, তবেই কেবল বিয়ে ভাঙবে। অন্যথায় স্বামীকে যতই অপছন্দ হউক, স্বামী যত বড় চোর-বাটপার স্ত্রীকে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে স্বামী মানতে হবে। হ্যাঁ, সে চাইলে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যেতে পারবে। কিন্তু যতদিন এই স্বামী জীবিত থাকবে, ততদিন কাউকে বিয়ে করতে পারবে না।
- : আপনার পয়েন্ট কী?
- - এই যে নারীদেরকে সরাসরি ডিভোর্সের অধিকার দেয়া হয় নি, এর কারণ নিয়ে কি আপনারা কখনো চিন্তা করেছেন? এর কারণ হল সেই বিয়ের আইনি সংজ্ঞা। ক্লাসিকাল আইনি সংজ্ঞায়ন ও কনসেপচুয়ালাইজেশন অনুযায়ী, বিয়ে হল একটা একপাক্ষিক চুক্তি। যে চুক্তিতে স্বামী একটি অধিকার লাভ করে, স্ত্রী একটি অধিকার প্রদান করে। সেই অধিকারটি হচ্ছে স্ত্রীকে ভোগ করার অধিকার। এই অধিকারটি বিয়ের চুক্তির মাধ্যমে স্বামীর স্থায়ীভাবে লাভ হয়ে যায়।
- : কিন্তু স্ত্রীও তো স্বামীকে ভোগ করতে পারছে।
- - হ্যাঁ, করছে। কিন্তু পরোক্ষভাবে। স্ত্রীকে এই আইনি অধিকার দেয়া হয় নি যে, স্বামীকে সহবাসে বাধ্য করতে পারবে। ইবনে আবেদীন তার বিখ্যাত রদ্দুল মুহতার নামক গ্রন্থে বলেন, له وطؤها جبرا إذا امتنعت بلا مانع شرعي، وليس لها إجباره على الوطء بعد ما وطئها مرة وإن وجب عليه ديانة أحيانا على ما سيأتي "স্বামী স্ত্রীকে জোর করে সম্ভোগ করতে পারবে যদি স্ত্রীর কোন শরয়ী অজুহাত না থাকে। কিন্তু স্ত্রী স্বামীকে সহবাসে বাধ্য করতে পারবে না যদি স্বামী তাকে (গোটা দাম্পত্য জীবনে) একবার সহবাস করে থাকে। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও মাঝেমধ্যে সহবাস করা স্বামীর জন্য ওয়াজিব।"
- এখন মাঝেমাঝে বলতে কতটুকু সময় সেটা নিয়ে আইনজ্ঞরা কথা তুলেছেন। কেউ বলেছেন মাসে চার মাসে একবার, কেউ বলেছেন চার দিনে একবার। আমি ওদিকে গেলাম না। কারণ আমার পয়েন্ট হচ্ছে বিয়ের ক্লাসিকাল সংজ্ঞা অনুযায়ী সহবাসের বিষয়টা একপাক্ষিক এটা তুলে ধরা। "ম্যারিটাল রেপ" এর বিষয়টার সাথে কনসেন্ট এর বিষয়টা যুক্ত। ক্লাসিকাল ফ্রেমওয়ার্কে এই কনসেন্ট স্ত্রী স্বামীকে বিয়ের চুক্তিতেই দিয়ে দিয়েছে। তাই নতুন করে স্ত্রীর মত নেয়ার কিছু নেই।
- দাম্পত্য জীবনে স্বামীর অধিকার কী ও স্ত্রীর অধিকার কী সেগুলোর একটা তালিকা ফিকহ বিশ্বকোষ মাওসুয়াহ ফিকহিয়া কুয়েতিয়া থেকে উল্লেখ করছি। স্ত্রীর অধিকার প্রথমে উল্লেখ করা যাক – মহর, খোরপোশ, সেবাযত্ন, অন্যান্য সতীনের সমান ট্রিটমেন্ট। স্বামীর অধিকারগুলো এবার দেখুন – স্ত্রী স্বামীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে, তার আনুগত্য করবে, স্বামী স্ত্রীকে সম্ভোগ করতে পারবে, স্ত্রীর উপর ডিসিপ্লিনারি একশন নিতে পারবে, স্ত্রী কাকে ঘরে ঢুকতে দিতে পারবে এবং স্ত্রী নিজে ঘর থেকে বের হতে পারবে কিনা সেটা নিয়ন্ত্রন করা।
- ক্লিয়ারলি স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে সুস্পষ্ট একটা হায়ারার্কি আছে। স্বামী যদি সাংসারিক বিষয়ে বেখেয়ালি হয় কিংবা দুশ্চরিত্র হয় তাহলে স্ত্রী কি স্বামীর উপর নিজে ডিসিপ্লিনারি একশন নিতে পারবে? ক্লাসিকাল ফ্রেমওয়ার্কে পারবে না। স্ত্রী যদি স্বামীকে বলে আমাকে ছেড়ে ঘরের বাইরে এত ঘণ্টার বেশি থাকতে পারবে না। স্বামী তার কথা শুনতে বাধ্য না। আপনি বলতে পারেন আইনিভাবে বাধ্য না হতে পারে, কিন্তু ইমোশোনাল দিকও তো আছে। আমি আবারও বলব, এই আইনি অসমতাই আবেগের অসমতা তৈরি করে। স্বামীকে স্বাধীনতা দেয়। স্ত্রীকে কোনঠাসা করে।
- : তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, ইসলামি আইনচর্চার নামে আমাদের ফুকাহারা নারীদের উপর অন্যায়-অবিচার করেছেন?
- - মোটেই না। কারণ স্বামী যে স্ত্রীর উপর এই অধিকারগুলো লাভ করতে যাচ্ছে এটা বিয়ের কনট্রাক্টের সময়ই অলিখিতভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাবুঝি হয়ে যায়। মৌন ও উহ্য থাকে। আর সেটাতে রাজি হয়েই স্ত্রী বিয়েতে মত দেয়। আর একারণেই ইসলামে মেয়ের অনুমতি এত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ফুকাহারা জানতেন যে, এই ফ্রেমওয়ার্কে বিয়ে করা মেয়ের জন্য কম্প্রোমাইজ। তাই তারা মেয়ের অনুমতি গ্রহণের ব্যাপারে প্রচণ্ড কঠোরতা করেছেন।
- : কিন্তু ক্লাসিকাল যেই ফ্রেমওয়ার্ক সেটা কি আল্লাহ-রাসুলের বলে দেয়া ফ্রেমওয়ার্ক নয়? কোরআনে কি বলা হয় নি যে, স্বামীরা স্ত্রীদের উপর কাওয়াম। যার তাফসিরে ইবনে কাসির বলেছেন, الرجل قيم على المرأة ، أي هو رئيسها وكبيرها والحاكم عليها ومؤدبها إذا اعوجت স্বামী স্ত্রীর পরিচালক অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর নেতা, তার বিচারক, তার ঊর্ধ্বতন, তার মাঝে বক্রতা দেখলে তাকে ডিসিপ্লিন-কারী। হাদিসে কি বলা হয় নি যে, فاتقوا الله عز وجل في النساء فإنهن عندكم عوان নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, তারা তোমাদের কাছে বন্দী। ইবনে তায়মিয়্যাহ লিখেছেন,
- وَمِلْكُ النِّكَاحِ نَوْعُ رِقٍّ وَمِلْكُ الْيَمِينِ رِقٌّ تَامٌّ وَأَبَاحَ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ أَنْ يَتَزَوَّجُوا أَهْلَ الْكِتَابِ؛ وَلَا يَتَزَوَّجُ أَهْلُ الْكِتَابِ نِسَاءَهُمْ؛ لِأَنَّ النِّكَاحَ نَوْعُ رِقٍّ كَمَا قَالَ عُمَرُ: النِّكَاحُ رِقٌّ؛ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ عِنْدَ مَنْ يُرِقُّ كَرِيمَتَهُ. وَقَالَ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ: الزَّوْجُ سَيِّدٌ فِي كِتَابِ اللَّهِ؛ وَقَرَأَ قَوْله تَعَالَى {وَأَلْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ}
- বিবাহলব্ধ মালিকানা আংশিক দাসত্ব, মিলকে ইয়ামিন পূর্ণ দাসত্ব। আল্লাহ মুসলিমদের আহলে কিতাব নারীদের বিয়ে করতে অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু কোন মুসলিম নারীকে আহলে কিতাব পুরুষের কাছে বিয়ে দেয়ার অনুমতি দেন নি। কারণ বিয়ের মাধ্যমে নারী স্বামীর আংশিক দাসত্বে প্রবেশ করে। উমার বলেছেন, "বিয়ে হচ্ছে দাসত্ব, সুতরাং লক্ষ্য রেখো তোমার অভিজাত কন্যাকে কার দাসত্বে পাঠাচ্ছ" (এটা আসমা ও আয়েশা থেকেও বর্ণিত যেমনটি হাফেয ইরাকি তাখরিজে আহাদিসে ইহইয়াতে বলেছেন) যায়দ বিন সাবেত বলেছেন, আল্লাহর কিতাবে স্বামীকে সাইয়িদ (মনিব) আখ্যা দেয়া হয়েছে "তারা দুজন তাদের মনিবকে দরজার কাছে পেল" (অর্থাৎ ইউসুফ যেহেতু দাস ছিলেন তাই মনিব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, ওদিকে জোলেখা যেহেতু স্ত্রী এবং স্ত্রী যেহেতু এক বিবেচনায় দাসী তাই তার স্বামীকে তার মনিব বলা হয়েছে)
- - ধন্যবাদ, এই আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়েই আমি তাজদীদ দেখতে চাই। কোরআন ও হাদিসে কিছু বিষয় আছে, তলবি (প্রেসক্রিপটিভ), কিছু বিষয় আছে ইনশাই (ডিসক্রিপ্টিভ)। কোরআন-হাদিসে যেই প্যাট্রিয়ার্কাল ফেমওয়ার্ক রয়েছে সেটা ডিসক্রিপ্টিভ। অর্থাৎ আল্লাহ কোরআনে সমাজের অবস্থা উল্লেখ করেছেন যে, পুরুষ নারীর উপর কর্তৃত্বশীল কারণ তারা নারীর ব্যয়ভার বহণ করে। রাসুল হাদীসেও সমাজের একটা ডিসক্রিপশন দিয়েছেন। পিতা ও কন্যার যেই হায়ারার্কি থাকে বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর সংসার করতে গিয়ে স্ত্রীও সেই হায়ারার্কিতে প্রবেশ করে। এ কারণে বিয়ের হিকমত হিসেবে ক্লাসিকাল স্কলাররা লিখেছেন –
- السَّرَخْسِيُّ: يَتَعَلَّقُ بِهَذَا الْعَقْدِ أَنْوَاعٌ مِنَ الْمَصَالِحِ الدِّينِيَّةِ وَالدُّنْيَوِيَّةِ، مِنْ ذَلِكَ حِفْظُ النِّسَاءِ وَالْقِيَامُ عَلَيْهِنَّ وَالإِنْفَاقُ، وَصِيَانَةُ النَّفْسِ عَنِ الزِّنَا
- ইমাম সারাখসি বলেছেন, "বিয়ের চুক্তির সাথে ধর্মীয় ও পার্থিব বিভিন্ন কল্যাণ সংযুক্ত আছে যার মাঝে রয়েছে, নারীদের প্রটেকশন, তাদের ভরণপোষণ, ব্যাভিচার থেকে আত্মরক্ষা।"
- প্যাট্রিয়ার্কাল ফ্রেমওয়ার্কে মেয়েরা সবসময় পুরুষের উপর নির্ভরশীল থাকে, প্রথমে বাবার ঘর করে, এরপর স্বামীর ঘর করে। মেয়ের বয়স বেড়ে গেলে বিয়ের জন্য পরিবার ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায় কারণ বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেলে মেয়েকে দেখেশুনে কে রাখবে? রাসুলের হাদিসে স্বামীকে ভক্তি ও আনুগত্য করার যেই বিবরণ দেয়া হয়েছে, তার সবই সমাজের একটি প্যাট্রিয়ার্কাল একটি সমাজের সাপেক্ষে চিন্তিত। ইসলাম মানব সমাজের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রন করে না। সমাজ প্যাট্রিয়ার্কিতে চলবে নাকি না, এটার মাঝে কোন সহজতা নেতিবাচকতা নেই। ইসলামি আইনশাস্ত্রের ফান্ডামেন্টাল একটি থিওরি হচ্ছে, আল আদাতু মুহাক্কিমাহ; সামাজিক প্রথাপদ্ধতি বিচারকের আসনে থাকবে। শরিয়ত যেটা করে সেটা হচ্ছে সামাজিক এই প্রথাগুলোকে মধ্যমপন্থায় রাখার চেষ্টা করে এবং এই প্রথাগুলো যেন বৈষম্য ও অত্যাচারের কারণ না হয় সেটা নিশ্চিত করে।
- ক্লাসিকাল সমাজে নারীর সমাজে কনট্রিবিউশন করার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। কারণ সেই সমাজের চালিকাশক্তি ছিল গতরশক্তি, কায়িক পরিশ্রম। যন্ত্রায়ন, শিল্পায়নের ফলে এই পরিস্থিতি পালটে গেছে। আগে দাসপ্রথা বিহীন সমাজ ছিল অকল্পনীয়। এখন যন্ত্র দাসের জায়গা দখল করেছে। আগে নারীদের গতর খাটুনি সমাজের খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারত না, কিন্তু এই যুগে নারীকে প্রয়োজন তার বুদ্ধি, মেধার কারণে। মিলিটারি কিংবা খেলাধুলাতে দেখবেন যে, এই যুগেও পুরুষরা নারীর চাইতে এগিয়ে, কারণ দৈহিক সক্ষমতার বিচারে বায়োলজিকালি পুরুষ এগিয়ে।
- মূল কথা হচ্ছে, সমাজ যদি দিনদিন ইগালিটারিয়ান হয়, তবে শরিয়তের আইন-কানুনও সেই অনুযায়ী এডাপ্ট করবে। সংসারে নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক অবদান যদি সমান হয়। তবে পুরুষের একচেটিয়া কর্তৃত্বের যেই ইল্লত ছিল (ভরণপোষণ) সেটা আর থাকবে না। পুরুষ নারীর কাওয়্যাম এরকম দাবিও এককথায় করে ফেলা যাবে না। কারণ المعلول يدور مع علته ثبوتا ونفيا অর্থাৎ যে বিষয়টি (মালুল) অন্য কোন বিষয়ের (ইল্লত) উপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই মালুল বা নির্ভরশীল বিষয়টির থাকা বা না-থাকা ইল্লত বা নির্ভরকৃত বিষয়ের থাকা বা না-থাকার উপর নির্ভর করে।
- এই সবকিছু মিলিয়ে যদি আমরা বিয়েকে হাম্বলি ফকিহদের সংজ্ঞা অনুযায়ী রিডিফাইন করি যে, বিয়ে হচ্ছে এমন চুক্তি যা নারী-পুরুষের যৌথ বিষয়গুলোতে উভর পক্ষকে সমান অধিকার প্রদান করে, তবে কিন্তু একটা প্যারাডাইম শিফট হবে।
- ডিভোর্সের অধিকার নারীও লাভ করবে। কারণ যেহেতু সমান-সমান অধিকারের ভিত্তিতে চুক্তি সাক্ষরিত হচ্ছে। এই নতুন প্যারাডাইমে স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য এককভাবে দায়িত্বশীল হবে না, এর বিপরীতে স্ত্রীও স্বামির ঘাড়ে ভর করে থাকতে পারবে না। বহুবিবাহের ফলে যেহেতু স্ত্রীর অধিকারে কমপ্রোমাইজ হয় (যেমন স্ত্রী যদি একজন হয় তবে তাকেই মাসের ৩০ দিন সময় দিতে হয়, অন্যদিকে দুই স্ত্রী থাকলে স্ত্রী-প্রতি ভাগ পড়ে ১৫ দিন। স্বামীর ইনকাম যদি এক লক্ষ টাকা হয়, তবে স্ত্রী প্রতি অর্ধেক করে ভাগ করতে হয় ইত্যাদি), তাই বহুবিবাহের জন্য স্বামীকে বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে, যেটা ক্লাসিকাল ফ্রেমওয়ার্কে নিতে হত না। একইভাবে ম্যারিটাল রেপ, ডিসিপ্লিনারি একশন মোটকথা সকল যৌথ বিষয়ে সমতা চলে আসবে আইন ও যুক্তির বিচারেই।
- দেখুন, আমাদের প্যারাডাইম শিফট করতেই হবে আজ হোক কিংবা কাল। আজ থেকে সাতশ বছর আগে ইবনে তায়মিয়্যাহ, তার মৃত্যুর পর তার ছাত্রদেরকে, তাদের ছাত্রদের ছাত্রদেরকে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে নারীর একটি অধিকার প্রতিষ্ঠার সক্রিয় হবার কারণে। কারণ তালাক বিষয়টা পুরুষের একচেটিয়া বিষয় ছিল। ইবনে তায়মিয়্যাহ বলেছেন, এমন স্বেচ্ছাচারিতা আর চলতে দেয়া যায় না। নারীর হায়েয চলাকালীন তালাক দিলে তালাক হবে না, নারীকে এক দফায় তিন তালাক দিলে একটাই তালাক হবে ইত্যাদি। ইবনে তায়মিয়্যাহ প্রচলিত ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে তাজদীদ এনেছিলেন। আজকে ইবনে তায়মিয়্যাহর এই ফাতওয়াই আল আযহারের ফতোয়া, মিসর থেকে মরক্কো পর্যন্ত এই ফতোয়া। আলি আল গুমারি, আলি জুমার ন্যায় সুফিবাদী আশআরী আলেমরা পর্যন্ত এই ফাতওয়া বরণ করে নিয়েছে। কারণ এটাই যুগের চাহিদা। ঠিক একইভাবে নারী-পুরুষের দাম্পত্যজীবনেও ইগালিটারিয়ান ভ্যালুজ আজ হোক, কাল হোক আসবেই। হয় আমরা এটা নিজে থেকে করব, নয়ত যুগ আমাদের পেছনে ফেলে যখন সামনে চলে যাবে, তখন আমরাই লজ্জার মাথা খেয়ে এটা করতে রাজি হয়ে যাব। সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলতে না পেরে আমরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলব। দেওবন্দ থেকে তিন বছর আগে ফতোয়া এসেছিল, ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা নাকি হারাম! কোথায় দুনিয়া, আর কোথায় তারা? খোদ দেওবন্দীরাই ইউটিউব, ফেসবুক ভরে ফেলেছে নিজেদের ছবি আর ভিডিও দিয়ে। আমরা কি চাই এমন জীবাশ্ম হয়ে পড়ে থাকতে? নাকি আমরা উসুলুল ফিকহের আলোকে পরিবর্তন ও সংস্কার আনতে চাই?
- : কিন্তু সমাজের এই যে পরিবর্তন এটা তো পশ্চিমা প্রভাবে হয়েছে।
- - পশ্চিমা প্রভাবটাও আল্লাহর সুন্নতে কাওনিয়্যাহর অংশ। তিনি চেয়েছেন যে, সমাজব্যবস্থা জগতজুড়ে পালটে যাবে, বলেই পালটে গেছে। আগেও বলেছি সমাজের এসব প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংগঠনিক বিষয়ের কোন সহজাত ভাল-খারাপ নেই। ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে সমাজের যেকোন বিষয়কে মধ্যমপন্থায় রাখা। এজন্য আমাদের উচিত উসুলুল ফিকহ ও মাকাসেদে শরিয়ত নিয়ে অধ্যয়ন করে ইসলামের সামাজিক দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করা। বিয়ের লক্ষ্য হচ্ছে হিফযুল আরাদ ও হিফযুন নাসল (সম্মান ও বংশ পরিক্রমার সংরক্ষণ)। এই লক্ষ্যকে নিশ্চিত রেখে, কোরআন-সুন্নতের নুসুসগুলোর হক রক্ষা করে, উসুল ও মাকাসেদ মেনে যেকোন পরিবর্তন ও সংস্কারকেই তাই আমাদের সাদরে গ্রহণ করা উচিত।
- তবে, এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, আমরা একটা ক্রান্তিকালে রয়েছি। আমাদের সমাজ থেকে প্যাট্রিয়ার্কি উঠে গেছে এমন না। তাই বিয়ের প্যাট্রিয়ার্কাল প্যারাডাইম এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি। কেউ ভাববেন না যে, আমি ক্লাসিকাল ডেফিনিশন ও ফ্রেমওয়ার্ককে ডিসমিস করে দিচ্ছি। না। আমি বরং বলছি নতুন প্যারাডাইমের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে। কারণ এই প্যাট্রিয়ার্কাল সমাজব্যবস্থা স্লোলি বাট শিওরলি বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে। নারী নেতৃত্ব ইত্যাদি নিয়ে আজকে আর কথা বললাম না। এমনিতেই লেখা বড় হয়ে গেছে। লেখা শুরুর সময় ভেবেছিলাম ১৫ মিনিটে লিখে ফেলব। এখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ২ ঘণ্টা চলে গেছে।
Advertisement
Add Comment
Please, Sign In to add comment