SheikSadi

রাহাগীরের স্বপ্ন

Nov 22nd, 2021
27
0
Never
Not a member of Pastebin yet? Sign Up, it unlocks many cool features!
text 15.95 KB | None | 0 0
  1. রাহাগীরের স্বপ্ন
  2.  
  3. মির্জ্জা রাহাগীর আল মাহী, আমার বড় ভাগ্নে, বয়স ১১। মিরপুরের এক খ্যাতনামা ইংরেজি মাধ্যমের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। সেই ছোট বয়স থেকেই ভাগ্নেকে দেখতাম তার মহাকাশ নিয়ে খুব আগ্রহ। শহুরে শিশুদের খেলার সঙ্গী ইউটিউবে তাকে দেখতাম মহাশূন্য নিয়ে নানান অ্যানিমেটেড ডকুমেন্টারি দেখছে। ক্লাস এইটে পশ্চাদ্দেশে সমাজশিক্ষক সোহরাব স্যারের বেতের বাড়ি খেয়েও যা শিখতে পারি নি, ইট-সিমেন্টের জেলখানায় বন্দী ভাগ্নেটা আমার ইউটিউব দেখেই তা অনায়াসে শিখে ফেলেছে। সৌরজগতের প্রত্যেকটা গ্রহ, সেই গ্রহগুলোর চাঁদ বা উপগ্রহের ইতিবৃত্তান্ত সব তার ঠোঁটস্থ। আমি স্বপ্ন দেখি ভাগ্নে আমার বড় হয়ে কোন মহাকাশ গবেষণাগারে জয়েন করবে। আমি তাকে নাসা-র কথা বলি। সেও স্বপ্ন দেখে।
  4.  
  5. আমার ভাগ্নের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে আমি সবচেয়ে বড় হিসেবে দেখি গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থাকে। ভাগ্নেকে আমি একেবারে গোঁড়া থেকে অংক বোঝানোর চেষ্টা করি। নামতা মুখস্থ করানোর চাইতে আমি তাকে মাল্টিপ্লিকেশনের কনসেপ্টটা বোঝানোর চেষ্টা করি। আমি চেষ্টা করেছি তাকে একেবারে গোঁড়া থেকে তার বোধগম্য ভাষায় গণিতের বেসিকগুলো রপ্ত করাতে। আমি বোঝালে সে মাশাআল্লাহ বোঝেও। কিন্তু বিপত্তি হল তার স্কুলের শিক্ষকরা এবং তাদের শিখনপদ্ধতি। এই বছর সে বীজগণিত শুরু করেছে। একদিন আমাকে ভাগ্নে ডাক দিয়ে বলল, সে সূচকের একটা অংকের উত্তর মেলাতে পারছে না। অংকটা নাকি পরীক্ষায় আসবে। ফোনের ওপার থেকে কথাটা শোনামাত্রই সারাজীবনের স্মৃতিগুলো একটা সুরঙ্গের মত মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠা শুরু করল। হায়, এভাবেই তো মেধাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়! পরীক্ষা! কত যে মেধাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছে এই অভিশপ্ত প্রক্রিয়ায়! সূচক কী বিষয়, সূচকের সাথে গুনের কি সম্পর্ক এগুলো ক্লিয়ার না করেই তাকে (√81)^4 সলভ করতে দিয়ে দিয়েছে! আর ভাগ্নে যে আমাকে ফোন দিয়েছে সেটাও তার মায়ের জোরাজুরিতে। আগামীকাল পরীক্ষা। যেকোন মূল্যে এই অংকটা মুখস্থ করে ফেলতে হবে। আমাকে একবারের জন্যও সূচকের বেসিক বোঝানোর জন্য না তার মা অনুরোধ করেছে, না সে নিজে করেছে, না তার স্কুলের শিক্ষকরা বেসিক বোঝানো প্রয়োজন ভেবেছে। একটা দায়সাড়া পদ্ধতি মুখস্থ করে অংকটা মেলাতে পারলেই কামিয়াব!
  6.  
  7. কী ইংলিশ মিডিয়াম, কী বাংলা মিডিয়াম, কী মাদ্রাসা - গোটা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাটাই ঘুণে ধরা। আকিদায়ে নাসাফিয়্যাতে ভাল নম্বর তোলা মাদ্রাসার একটা ছাত্রকে কাছে ডেকে এই বাক্যটা পড়ে শোনান
  8. حقائق الأشياء ثابتة والعلم بها متحقق
  9. “যাবতীয় বিষয়ের বাস্তবতা সুসাব্যস্ত, আর এই বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান সত্য ও বাস্তব” এরপর তাফতাযানির শারহ থেকে একটা বাক্য أن المراد الجنس “এখানে শ্রেণী হিসেবে কথাটি বলা হয়েছে” তাদের ব্যাখ্যা করতে বলুন। আমি পুরো অনুচ্ছেদটা দিয়ে দিচ্ছি যদি মাদ্রাসায় পঠিত বিষয়বস্তুর সফিস্টিকেশন নিয়ে কারো সন্দেহ থাকে।
  10.  
  11. قيل المراد العلم بثبوتها للقطع بأنه لا علم بجميع الحقائق
  12. والجواب أن المراد الجنس ردا على القائلين بأنه لا ثبوت لشيء من الحقائق ولا علم بثبوت حقيقة ولا بعدم ثبوتها
  13.  
  14. “কেউ কেউ বলতে প্ররোচিত হয়েছেন যে এখানে জ্ঞান বলতে সুসাব্যস্ত হওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বোঝানো হয়েছে, কারণ নিশ্চিতভাবেই সকল বিষয়ের বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান আমাদের নেই। এর খণ্ডনে আমরা উত্তর দিব, এখানে শ্রেণী হিসেবে কথাটি বলা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে তাদের খণ্ডন করা হয়েছে যারা দাবি করে কোন বিষয়েরই কোন বাস্তবতা নেই, না কোন বাস্তবতা সাব্যস্ততা বিষয়ে জ্ঞান আছে, না বাস্তবতাবিহীন হবার ব্যাপারে জ্ঞান আছে।”
  15.  
  16. রীতিমত দর্শন ও অস্তিত্ববাদের উপর প্রাথমিক একটা জানাশোনা ছাড়া এই কথাকে বোঝা কারো কম্ম না। আসলে সমস্যাটা আমাদের কারিকুলামে না। কারণ গাযালি, রাযি, ইবনে তায়মিয়্যাদের মত দার্শনিকদের জন্ম এসব পাঠ্যপুস্তক পড়েই হয়েছে। ইবনে তায়মিয়্যাহকে দিন, তিনি এই বাক্যের ব্যাখ্যায় ২০০ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারবে। আর আমাদের বাংলাদেশের ছাত্ররা?
  17.  
  18. সন্তানদের পড়াশোনার মান নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ হবে যে, আপনারা দয়া করে নিজের সন্তানদের এসব দায়সাড়া স্কুল ও শিক্ষকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে যাবেন না। নিজে সশরীরে সপ্তাহে একদিন হলেও সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে বসবেন। আমি জ্ঞানের স্পেশালাইযেশনে বিশ্বাস করি। আমি বড়বোনকে বলে দিয়ে এসেছি, এত দুনিয়ার সাবজেক্টে তার ভাল করা লাগবে না। ভাগ্নের যেহেতু বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ আছে, সে তার সময়ের ৮০ ভাগ গণিতের জন্য বরাদ্দ রাখবে। জেনারেশন জেড হওয়ায় ইংরেজি সে এমনিতেই পারে। বিজ্ঞান বইটাও সাহিত্যের ভাষায় লেখা। সমাজ, ধর্ম, বাংলা এসব অল্প একটু সময় দিলেই হয়ে যাবে। সমাজ, ইতিহাস কিংবা ধর্ম আসলে মানুষ বড় হতে হতে আস্তেধীরে শিখে নেয়। বাংলা হল চর্চার বিষয়। আমি ভাগ্নের জন্য কয়েকটা রঙিন ছবিওলা বই কিনে দিয়েছি। মহাকাশ নিয়ে লেখা একটা কিশোর পত্রিকাও গিফট দিয়েছি। নিয়মিত বাংলা পড়ার অভ্যাস থাকলে এমনিতেই বাংলা শেখা হয়ে যাবে।
  19.  
  20. কেবল পরীক্ষায় ভাল করার জন্য পড়াশোনা করার মত বিধ্বংসী কিছু নেই। এটা না একজন ব্যক্তির জন্য ভাল, না একটা জাতির ভবিষ্যতের জন্য। আমাদের দেশের হর্তাকর্তাদের কি আদৌ কোনদিন বোধোদয় হবে? বয়স তো আমাদের জাপান, কোরিয়ার চাইতে খুব বেশি না। পরপর দুইটা বোম ফেলে, গোটা ভূখণ্ড মার্কিন উপনিবেশে পরিণত হওয়া সত্তেও জাপানকে দেখুন গত বিশ-ত্রিশ বছর ধরে বিশ্বের প্রথম শ্রেণীত একটা দেশ হয়ে আছে। আটানব্বইয়ের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন তারা করল। কত অল্প সময়ে কী বিরাট উন্নতিই না তারা সাধন করল! অর্থনীতি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বলেন, সমাজ ও শৃংখলা বলেন। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। আমি মনে করি এই সাফল্যের পেছনে যা কাজ করছে তা হল প্রকৃত শিক্ষা। এটা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা কারিগরি শিক্ষা নয়। সামাজিক শিক্ষাও। আজ আমাদের দেশে এই শিক্ষার কোন বালাই নেই। “ইসলাম ও নৈতিকতা” পরীক্ষায় ছাত্ররা নকল করে পাশ করেছে এমন তথ্য আমি আমার টিউটোরিং করানো ছাত্রের মুখে শুনেছি। সেই ছোট্ট বয়স থেকেই এই দেশের একটা শিশু দুর্নীতির সবক লাভ করে তার স্কুল থেকে। অন্যের খাতা দেখে লেখা, পরীক্ষার হলে প্যান্টের ভেতরের পকেটে করে স্মার্ট ফোন নিয়ে যাওয়া। এই দেশে না কারিগরি শিক্ষার বালাই আছে, না আছে সামাজিক শিক্ষা। মাদ্রাসাগুলোতে দেখেন শিশু নির্যাতন ও নিপীড়নের আখড়া চলছে।
  21.  
  22. আমরা কি চাই না ঘুরে দাঁড়াতে? বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব করার মত কোন সভ্যতা, সাম্রাজ্য অতীতে না থাকতে পারে, তাই বলে কি ভবিষ্যতেও থাকবে না? আমরা কি দুনিয়াতে এসেছি একের পর অন্যের গোলামি করার জন্য? সেই আর্যদের সময় থেকে শুরু হল এই দাসত্ব, একাত্তরে আমরা স্বাধীন হলাম। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জন্য না হয়ে যদি গোটা সমাজ ও জাতির জন্য কি হতে পেরেছে? আমি সন্দিহান। অতীত নিয়ে পড়ে থাকা লোক আমি নেই। গত ৫০ বছরে যা হবার হয়েছে। সেই গ্লানিতে আমি থমকে পড়তে চাই না। আমি চাই কারিগরি ও সামাজিক শিক্ষার অবকাঠামোগত (যার মাঝে যোগ্য শিক্ষক, উপযুক্ত শিখনপদ্ধতি, যথার্থ যাচাইপদ্ধতি থাকবে) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সরকারে হাতে নিক। গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, প্রোগ্রামিং অলিম্পিয়াড, দাবা টুর্নামেন্ট এগুলো খুবই ব্যাপক ও জনপ্রিয় করে তোলা হোক। কেবল অভিজাত শহরের মুষ্টিমেয় স্কুলে নয়। বরং গ্রামেগঞ্জের, মফস্বলের ছাত্রছাত্রীরাও এতে অংশ নিক। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বক্তৃতা প্রদান, প্রবন্ধ রচনা এসবের দিকেও গুরুত্ব দেয়া হোক। জাতিকে নেতৃত্ব দিতে প্রয়োজন নেতৃত্বের গুণাবলিপূর্ণ একটি তরুণ প্রজন্ম। আর এটা মাথায় রেখেই উচিত আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সাজানো।
  23.  
Advertisement
Add Comment
Please, Sign In to add comment