Not a member of Pastebin yet?
Sign Up,
it unlocks many cool features!
- স্ত্রী স্বামীকে সেজদা করবে এ কেমন কথা!
- =
- হালিমা সাদিয়া নাম্নী বোন প্রশ্ন করেছেন "যদি আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাউকে সেজদাহর আদেশ দিতাম তাহলে মহিলাদেরকে আদেশ করতাম স্বামীদের সেজদাহ করতে.. " এই হাদিস সম্পর্কে জানতে চাই..
- .
- উত্তর:
- .
- এই হাদিসের টেক্সট নিয়ে আলাপের পূর্বে প্রয়োজন হাদিসের কনটেক্সট নিয়ে আলোচনা। কোন এদিক-সেদিকের কথা না বলেই স্বীকার করে নিচ্ছি যে, হাদিসের বাক্যগুলো আধুনিক সমাজের একজন মানুষের কাছে খুবই অফেন্সিভ। আর এর জন্য দায়ী হচ্ছে, আপনি সপ্তম শতকের একটা টেক্সটকে বিচার করছেন একবিংশ শতাব্দীর কনটেক্সট দিয়ে!
- .
- প্রথমত – হাদিসের সবচেয়ে প্রবলেমেটিক শব্দটা চিহ্নিত করা যাক। সেটা হচ্ছে সেজদা।
- এখন কথা হল, সেজদা বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে?
- এবাদত, উপাসনা, দাসত্ব, বন্দেগী?
- তাওহিদের ঝাণ্ডাধারী একজন নবীর পক্ষে কি কখনো আল্লাহ ব্যতীত কোন কিছুকে এবাদত করার কথা উপমা হিসেবেও মুখে উচ্চারণ করা সম্ভব! এ তো নির্ঘাত ব্লাসফেমি! ধর্ম ও নবির অবমাননার শামিল। সাইয়েদুল মুরসালিন, সকল নবির সর্দারের ব্যাপারে আপনি কীভাবে চিন্তা করলেন যে, তিনি উপমা হিসেবে এতটা ক্যাজুয়াল সুরে একজন সামান্য তুচ্ছ মানুষকে এবাদত করার কথা বলবেন! অসম্ভব।
- তাহলে সেজদা বলে তিনি কী বোঝালেন? আমরা তো সেজদা বললে এবাদত ও দাসত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু বুঝি না!
- আপনি বোঝেন না মানুষ হিসেবে আপনার জানাশোনার সীমাবদ্ধতার কারণে। সেজদা যে আজকে এবাদতের সমার্থক হয়ে গিয়েছে এটা হল গত চৌদ্দশ বছর ধরে মুসলিম জাতির তাওহিদ চর্চার ফসল। অথচ নবির আগমনের সময়ে কিংবা পূর্বে সেজদা মানেই এবাদত ছিল না। বরং মানবজাতির ইতিহাসে সর্বপ্রথম যেই সেজদার ঘটনা আছে সেটাও এবাদতের উদ্দেশ্যে সেজদা নয়। আল্লাহ ফেরেশতাদের কি আদমের এবাদত করার জন্য সেজদা করতে বলেছিলেন নাকি আদমের ভক্তি করার জন্য? সুরা ইউসুফ পড়ুন। নবি ইউসুফকে সিংহাসনে বসিয়ে তার পদতলে ইউসুফ নবির পিতা ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম), তার স্ত্রী এবং দশ পুত্র যে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন সেটা কি এবাদত হিসেবে ছিল?
- প্রশ্নই আসে না।
- .
- বরং এ সেজদা ছিল ভক্তির সেজদা। ইউসুফ নবিকে সেজদা করে ইয়াকুব নবি ছোট হয়ে যান নি। কারণ নবি ইয়াকুবের জন্য যেমন নবি ইউসুফকে সেজদা করার অনুমতি ছিল, তেমনি নবি ইউসুফের জন্যও ছিল পিতাকে সেজদা করার। ভক্তি প্রদর্শন করার। আপনাকে আমি ভক্তি করি, এর অর্থ আপনি আমাকে ভক্তি করেন না – এ রকম না। কোরআনে কেবল ইউসুফকে ইয়াকুবের সেজদা করার কথা এসেছে, এর অর্থ এই নয় যে, ইউসুফ কোনদিন ইয়াকুবকে সেজদা করেন নি। যুক্তির দাবি হচ্ছে্ ইউসুফ নবি তার পিতা ইয়াকুবকে সেজদা করেছেন, একবার না, বহুবার করেছেন। কিন্তু কোরআনে যেহেতু ইউসুফ নবির ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছিল, ইউসুফ নবির মাহাত্ম্য উল্লেখ করা মূখ্য ছিল, তাই ইয়াকুবকেও ইউসুফ নবি পালটা সেজদা করেছিলেন কিনা সেই ইতিহাস বিশ্লেষণে কোরআন যায় নি।
- .
- এবার উল্লিখিত হাদিসটি সম্পূর্ণটুকু পাঠ করা যাক।
- قال لما قدم معاذ من الشام سجد للنبي صلى الله عليه وسلم فقال " ما هذا يا معاذ ؟ " قال أتيت الشام فوافيتهم يسجدون لأساقفتهم وبطارقتهم ، فوددت في نفسي أن أفعل ذلك لك . فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم فلا تفعلوا فإني لو كنت آمرا أحدا أن يسجد لغير الله لأمرت المرأة أن تسجد لزوجها
- সাহাবি মুয়ায বিন জাবাল শাম দেশ থেকে ফেরত এসে নবির পায়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। নবি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘এটা কী করছ, হে মুয়ায!’ মুয়ায উত্তরে বলেন, ‘আমি শামদেশে দেখেছি যে মানুষজন বিশপ ও প্যাট্রিয়ার্কদের পায়ে সেজদা করে। এটা দেখে আমার মনে শখ হয় যে, আপনার শানেও একই কাজ করব।‘ আল্লাহর রাসুল (সাঃ) উত্তর দিয়ে বললেন, ‘আমি যদি কাউকে সেজদা করার আদেশ দিতাম, তবে সেটা হত কোন নারীকে তার স্বামীর উদ্দেশ্যে।’
- .
- والذي نفس محمد بيده لا تؤدي المرأة حق ربها حتى تؤدي حق زوجها
- .
- এখন প্রশ্ন আসছে যে, আগেকার নবিদের শরিয়তে যে কাজ খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল সেটা কেন আমাদের শরিয়তে হারাম করে দেয়া হল? উত্তর হচ্ছে : অনিয়ন্ত্রিত ভক্তি ও অজ্ঞতা খুব শীঘ্রই মানুষকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়। নুহ আঃ এর কওমের প্রথম প্রজন্ম সাতটা ভাস্কর্য বানিয়েছিল কেবল ভক্তি দেখাতে, তারা শিরক করে নি। শিরক শুরু হয়েছে তার পরের প্রজন্মে। যখন শয়তান তাদের অজ্ঞতার সুযোগে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তাদের পিতৃপুরুষরা এই ভাস্কর্য বানিয়েছিল এবাদতের উদ্দেশ্যে।
- .
- তো যাই হোক, মূল কথায় ফিরে আসি।
- আমি নিজে একজন জাপানি সংস্কৃতি ও সভ্যতার ছাত্র। জাপানি কালচারে এখনো এই সেজদা করার বিষয়টি আছে। তারা একে দোগেজা [https://en.wikipedia.org/wiki/Dogeza] বলে। এই দোগেজা জাপানি সোসাইটিতে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। ধরুন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করেছে, বাসায় এসে দোগেজা করে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিল। সাধারণত ক্ষমা চাওয়ার জন্যেই জাপানিরা দোগেজা করে থাকে। সম্মান প্রদর্শনের জন্যও তারা দোগেজা করে। আপনি যদি ট্র্যাডিশনাল জাপানি হোটেলে যান, যেমন কিয়োতো কিংবা ওসাকাতে, তবে দেখবেন যে, সেখানে জাপানি মেইডরা অতিথিদের দোগেজার মাধ্যমে বরণ করে নিচ্ছে। এই হাদিসটা যদি আপনি কোন জাপানিকে শোনান, সে আপনার-আমার মত আঁতকে উঠবে না। কারণ সেজদা বলে তারা সম্মানী ব্যক্তিকে সম্মান প্রদান কিংবা ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা হিসেবে বোঝে, দাসত্ব বোঝে না।
- .
- আশা করি এবার হাদিসের কনটেক্সটটা ক্লিয়ার হয়েছে। আপনি জাপানি কালচারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এই সেজদা/দোগেযাকে আহামরি কিছু মনে হবে না। বরং নিত্যদিনের স্বাভাবিক মানবীয় একটি রীতি বা অভ্যাস মনে হবে কেবল।
- .
- আল্লাহর রাসুল মুয়াযের কথার কীরকম ক্যাজুয়াল জবাব দিয়েছেন খেয়াল করে দেখুন! এখানে যদি দাসত্ব কিংবা মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে উপাসনা, আরাধনা করার মত শিরকি বিষয় থাকত, নবির চেহারা ক্রোধে লাল হয়ে যেত। নবিকে এবাদত হিসেবে সেজদা করার কারণে মুয়াযকে কঠোর কোন শাস্তিও হয়ত ভোগ করতে হত। কিন্তু এসবের কিছুই হয় নি, কারণ ঘটনার কুশীলবদের কাছে যেই কনটেক্সট ছিল সেটা মোটেও আপনার বায়াস, প্রেজুডিস ও প্রিকনসেপশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
- .
- এবার একটু ব্যকরণের দিকে আশা যাক। “যদি আমি কাউকে সেজদা করার আদেশ দিতাম” হচ্ছে শর্ত, “স্ত্রীকে আদেশ করতাম স্বামীকে সেজদা করতে” এটা হচ্ছে শর্তের জবাব। উসুলে ফিকহের সর্বস্বীকৃত মত হচ্ছে, শর্তের জবাব তখনই মিনিংফুল হয় যখন স্বয়ং শর্তটি মিনিংফুল হয়। কারণ এখানে দুটো বিষয়ের মধ্যে তুলনা করা হচ্ছে। সেজদা করার বিষয়টিই যদি আগাগোড়া নিন্দনীয় হয়, তাহলে এই শর্তের তো কোন মিনিং-ই থাকে না। উদাহরণ দেই। রাসুল হাদিসে বলেছেন, জামাতে নামায ঘরে নামাযের ২৭ গুণ বেশি সওয়াব রাখে। এখন ঘরে নামায পড়লে যদি কোন সওয়াবই না হয়, তাহলে জামাতে নামায পড়ার সওয়াব হবে ২৭ গুণন ০ অর্থাৎ শূন্য। কোন সওয়াব হবে না!
- একই কথা এই হাদিসের ক্ষেত্রে, নবি বোঝাচ্ছেন যে, আমি যদি পূর্বের নবিদের শরিয়ত মত, যা তুমি হে মুয়ায শামদেশে দেখে এসেছ, কোন মানুষকে ভক্তিভরে সেজদা করার অনুমতি বা আদেশ দিতাম, তবে সেই ভক্তি পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তি হচ্ছে একজন স্বামী, এমনকি ধর্মগুরু, পীর কিংবা যাজকদের শামদেশে মানুষ যেভাবে ভক্তি করে তার চেয়েও বেশি একজন স্ত্রীর উচিত স্বামীকে ভক্তি করা। আর এ কারণেই রাসুল সাঃ হাদিসটি শেষ করেছেন নিম্নোক্ত কথা বলে
- —
- والذي نفس محمد بيده لا تؤدي المرأة حق ربها حتى تؤدي حق زوجها
- মুহাম্মাদের জান যার হাতে তার কসম! স্বামীর হক আদায় না করে কোন স্ত্রী আল্লাহর হক আদায় করতে পারবে না।
- .
- কেন পারবে না? কারণ স্বয়ং আল্লাহই যে স্ত্রীকে আদেশ দিয়েছেন স্বামীর হক আদায় করতে। যেভাবে ফেরেশতাদের আদেশ দিয়েছেন মাটির তৈরি আদমকে সেজদা করতে! ফেরেশতারা জিন্দেগিতে কোন পাপ করে নি, কোন ত্রুটি-বিচ্যুতির শিকার হয় নি। অথচ আদমকে সৃষ্টি করার কিছু মুহুর্ত পরেই তিনি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে বসেন। আদমের সন্তানরা যে জমিনে রক্ত ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে সেটা ফেরেশতারা জানত, কিন্তু তারপরেও আল্লাহ যখন ত্রুটিপূর্ণ মানবকে সেজদা করতে ফেরেশতাদের আদেশ করেছেন, তখন শয়তান ছাড়া কেউই এই আদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নি। কারণ ফেরেশতারা আদমকে সেজদা করেছে আল্লাহর দিকে তাকিয়ে, কিন্তু শয়তান আল্লাহর কথা না ভেবে ভেবেছে নিজের ও আদমের কথা। আদমকে কেন সেজদা করব? সে তো মাটির তৈরি। আমি আগুনের। আমিই তো শ্রেষ্ঠ! আদমের উচিত আমাকে সেজদা করা। আমি কেন আদমকে সেজদা করতে যাব? শয়তান যেটা বোঝে নি তা হল এই সেজদা অনুষ্ঠানে আদম ছিলেন কেবলই এক উপলক্ষ্য। মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহর কথাকে চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ রাখতে কারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, আর কারা নিজেদের ইগো ও আত্মশ্লাঘার জেরে আল্লাহর আদেশ তথা শরিয়তের উপরে রাখতে চায়।
- .
- একজন মুমিন নারী হিসেবে রাসুলের এই হাদিসটি শোনার পর আপনার মনে ঠিক সেই অনুভূতিই আসা উচিত যে অনুভূতি ইয়াকুব নবির মনে এসেছিল ইউসুফ নবিকে সেজদা করার ক্ষেত্রে। নিজেকে তুচ্ছ কিংবা স্বামীর মনিব ভেবে না, বরং আল্লাহর আদেশ হিসেবে কেবল। ফেরেশতারা কেউ আদমের গোলাম ছিল না। তারপরও তারা আদমকে সেজদা করেছে। আর বোন, বিষয়টা তো এক তরফা না। এই হাদিসে না হয় স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভক্তি কেমন হবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অন্য হাদিসেই কিন্তু বলা হয়েছে নারীর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত! যদি স্ত্রীর জন্য আমাদের শরিয়তে স্বামীকে ভক্তিভরে সেজদা করা কর্তব্য হত, তবে সেটা সন্তানের জন্য তার মাকে সেজদা করার ক্ষেত্রেও হত!
- আশা করি বোঝাতে পেরেছি। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
- .
- বিঃদ্রঃ কেউ কেউ রাসুলে কারিমের এই হাদিসটির ব্যাপারে উত্থাপিত প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পেরে হাদিসটি অস্বীকার করার শর্টকাট রাস্তা বেছে নিয়েছেন। তারা খেয়াল করেন নি যে, এই হাদিসটি ছয়জন সাহাবি থেকে ভিন্ন সুত্রে বর্ণিত হয়েছে - আয়েশা, আনাস বিন মালেক, কায়স বিন সাদ, মুয়ায বিন জাবাল, আবু হুরায়রা, আব্দুল্লাহ বিন আওফা প্রমুখ। শায়খ আকরাম নদভি বলেছেন, মুয়ায বিন জাবালের রেওয়ায়াত উল্লেখ করে বলেছেন যে, তিনি তো কোনদিন শামেই যান নি। সেজদা করতে দেখবেন কোত্থেকে? শায়খ যেটি খেয়াল করেন নি তা হল, হাদিসটি মুয়ায ছাড়াও আরো ৫ জনের সুত্রে বর্ণিত আছে। একটা ভিত্তিহীন ঘটনার পক্ষে এতগুলো সুত্র থাকা একটু কষ্টকর। তার চেয়ে বড় কথা হল - হাদিসটিকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলে এই জিমন্যাস্টিক্সের প্রয়োজনই পড়ে না।
Advertisement
Add Comment
Please, Sign In to add comment